কুড়িগ্রামে ব্রহ্মপুত্র নদের বুকে ছড়িয়ে আছে তিনশরও বেশি চর। দিগন্তবিস্তৃত এসব চরাঞ্চলে একসময় দল বেঁধে ঘুরে বেড়ানো মহিষের পাল ছিল নিত্যদিনের দৃশ্য। কালের বিবর্তনে সে চিত্র হারিয়ে গেছে। চরবাসীদের জীবন ও জীবিকার সঙ্গে মহিষ পালন ছিল ওতপ্রোতভাবে জড়িত। কিন্তু বর্তমানে সেই সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে কমে এসেছে। চরগুলোতে এখন কদাচিৎই কিছু মহিষের দেখা মিলে।

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর বলছে, এ ধারা অব্যাহত থাকলে আগামী পাঁচ থেকে ছয় বছরের মধ্যে ব্রহ্মপুত্র পাড়ের চরাঞ্চল থেকে মহিষ পালনের ঐতিহ্য পুরোপুরি বিলুপ্ত হয়ে যাবে। 

এ সংকট মোকাবিলায় গত বছরের জানুয়ারিতে কুড়িগ্রাম প্রাণিসম্পদ দপ্তর থেকে জেলার নাগেশ্বরী উপজেলার বামনডাঙ্গা এলাকায় একটি মহিষ প্রজনন খামার স্থাপনের জন্য অধিদপ্তরে একটি প্রস্তাবনা পাঠানো হয়। তবে এখন পর্যন্ত সেই প্রস্তাবনার বিষয়ে কোনো জবাব আসেনি।

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, এক দশক আগেও ব্রহ্মপুত্র নদের চরাঞ্চলগুলোতে প্রায় ৫৫ হাজার মহিষ ছিল। বর্তমানে সেই সংখ্যা মাত্র চার হাজারে নেমে এসেছে। লালমনিরহাটের তিস্তা নদীর চরে একসময় পাঁচ হাজার মহিষ থাকলেও বর্তমানে সেখানে রয়েছে ৫০০টিরও কম।

চরের বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তৃণভূমি সংকুচিত, মহিষ থেকে গৃহীত দুধের পরিমাণ কমে যাওয়াসহ নানা সংকটে চরের বাসিন্দারা মহিষ পালনে অনাগ্রহী হয়ে পড়ছেন।
একসময় চরে প্রচুর উন্মুক্ত ও অব্যবহৃত জমি থাকলেও এখন প্রায় সব জায়গাতেই চাষাবাদ হচ্ছে। ফলে মহিষের খাবারের জন্য প্রয়োজনীয় তৃণভূমি এবং অবাধে ঘোরাফেরার মতো খোলা চরাঞ্চল আর আগের মতো পাওয়া যায় না।

কুড়িগ্রামের উলিপুরে ব্রহ্মপুত্র নদের দুর্গম ঘুঘুমারী চরের কৃষক জাকের আলী বলেন, ১০ বছর আগে আমার ১৬টি মহিষ ছিল। এখন মাত্র দুটি আছে। সেগুলোও বিক্রির জন্য চেষ্টা করছি। আগে মহিষের দুধ দিয়ে দই ও ছানা তৈরি করে বিক্রি করতাম। এখন লাভ না থাকায় আমার মতো অনেকেই মহিষ পালন ছেড়ে দিচ্ছে।

চরে মহিষের সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে কমে যাওয়ায় বিপাকে পড়েছেন মিষ্টি ব্যবসায়ীরা। মহিষের দুধ থেকে নানা ধরনের মিষ্টান্ন তৈরি করে যারা ব্যবসা করতেন, তাদের বিক্রি ও আয় দুটোই কমে গেছে।

উলিপুরের বেগমগঞ্জের মিষ্টি বিক্রেতা নাসির উদ্দিন বলেন, আগে মহিষের দুধ নিয়মিত পাওয়া যেত। দুধ থেকে দই ও ছানা তৈরি করে আমরা শহরেও সরবরাহ করতাম। ৪ বছর ধরে এ ব্যবসা প্রায় বন্ধ।

তিনি আরও বলেন, এখন বিশেষ কোনো অর্ডার পেলে খুব কষ্ট করে দুধ জোগাড় করি। কয়েক বছরের মধ্যে চরের মহিষের দুধ পুরোপুরি দুর্লভ হয়ে যাবে।

চিলমারীর চরের ঢুষমারা এলাকার বাসিন্দা শামসুল ইসলাম বলেন, একসময় মহিষ পালন ছিল চরাঞ্চলের গর্ব। আগে আমার ১০টি মহিষ ছিল, এখন একটিও নেই। মহিষ যে ঘাস খাবে চরে তো সেই ঘাস নেই বললেই চলে। তবে উন্নত জাতের মহিষ যদি পেতাম তাহলে আবার লালন-পালন শুরু করতাম।

কৃষক কাসেম আলীর বাড়ি লালমনিরহাটের হাতীবান্ধা উপজেলার তিস্তা নদীর চর গড্ডিমারীতে। কয়েক বছর আগেও তাদের চরটিতে মহিষের পাল চোখে পড়তো। কিন্তু এখন যেখানে একটি মহিষেরও দেখা মিলে না। 

কাসেম বলেন, যেখানে উন্নত জাতের মহিষ থেকে দিনে ১০–১৫ কেজি দুধ পাওয়া সম্ভব, সেখানে দেশি মহিষ থেকে তিন কেজির বেশি দুধ পাওয়া যায় না। উন্নত জাতের মহিষ পালন লাভজনক।

কুড়িগ্রাম জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. হাবিবুর রহমান দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, চরাঞ্চলে উন্নত জাতের মহিষ সরবরাহ করা না গেলে আগামী কয়েক বছরের মধ্যে এই অঞ্চলে চরের মহিষ পালন সম্পূর্ণভাবে হারিয়ে যাবে। 

তিনি আরও বলেন, গত বছরের জানুয়ারিতে আমরা নাগেশ্বরীর বামনডাঙ্গায় একটি মহিষ প্রজনন খামার স্থাপনের জন্য সরকারের কাছে প্রস্তাব পাঠিয়েছিলাম। এখনো পর্যন্ত কোনো অনুমোদন আসেনি। আমরা নিয়মিতভাবেই মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছি।

হাবিবুর রহমান বলেন, উন্নত জাতের মহিষ সরবরাহ করা গেলে চরবাসীদের আগ্রহ ফিরে আসবে বলে আমরা আশাবাদী। কারণ উন্নত জাতের মহিষ থেকে বেশি দুধ উৎপাদন সম্ভব, এতে চরাঞ্চলের কৃষকরা আর্থিকভাবে লাভবান হবেন।