সন্তানদের ঝলমলে সাফল্য আর অঢেল প্রতিপত্তির ভিড়ে একজন বৃদ্ধা মায়ের নিঃসঙ্গ ও বিভীষিকাময় মৃত্যুর খবরটি আজ পুরো সমাজকে এক চরম আত্মজিজ্ঞাসার কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। চারপাশের সুউচ্চ দালানকোঠা আর তথাকথিত ‘আধুনিক’ জীবনের জৌলুসকে উপহাস করে যখন এক ফ্ল্যাটের ভেতর থেকে প্রবীণ মায়ের গলিত ও বিকৃত মরদেহ উদ্ধার করা হয়, তখন তা কেবল একটি মৃত্যুর খবর থাকে না; তা হয়ে ওঠে আমাদের সামগ্রিক সামাজিক মূল্যবোধের এক বীভৎস ময়নাতদন্ত।

যে সন্তানরা সমাজের উঁচুতলায় বসবাস করেন, তাঁদের জন্মদাত্রী মায়ের এই পরিণতি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এটি আমাদের পরিবার ব্যবস্থার ভেতরের চরম শূন্যতা এবং মানবিকতার এক ভয়াবহ দেউলিয়াত্বকে নির্দেশ করে।

আজকের এই ক্ষয়িষ্ণু সময়ে দাঁড়িয়ে আমাদের গভীরভাবে ভাবার সময় এসেছে, পিতা-মাতার সুরক্ষা ও অধিকার আদায়ে আমরা কি শুধুই আইনের দিকে চেয়ে থাকব? আমাদের দেশে পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ আইন রয়েছে, যার নানাবিধ আইনি ফাঁকফোকর ও সীমাবদ্ধতা নিয়ে বিস্তর আলোচনা হতে পারে। অপরাধী সন্তানের দেওয়ানি বা উত্তরাধিকারের অধিকার কেড়ে নেওয়ার মতো কঠোর ধারার অভাবকে আইনের পরাজয় বলে আখ্যা দেওয়া যেতে পারে। কিন্তু সত্য এটাই যে, যেখানে রক্তের সম্পর্ককে টিকিয়ে রাখার জন্য আদালতের ডিক্রি বা পুলিশের লাঠির প্রয়োজন হয়, সেখানে সমাজ হিসেবে আমাদের পতন অনেক আগেই ঘটে গেছে।

আইন দিয়ে হয়তো বাধ্যবাধকতা তৈরি করা যায়, কিন্তু ভালোবাসা বা শ্রদ্ধা তৈরি করা যায় না। একজন সন্তানকে ভয় দেখিয়ে মাসে মাসে কিছু টাকা পাঠাতে বাধ্য করা হয়তো আইনের পক্ষে সম্ভব, কিন্তু ডিমেনশিয়া বা আলঝেইমারে আক্রান্ত একাকী মা-বাবার শয্যাপাশে বসে একটু পরম মমতায় হাত বুলিয়ে দেওয়া, কিংবা তাঁদের শৈশবের মতো আগলে রাখার যে মানবিক তাড়না, তা কোনো ধারা বা উপধারা দিয়ে তৈরি করা অসম্ভব।

আমাদের বর্তমান শিক্ষা ও সামাজিক ব্যবস্থা আজ এমন এক অন্ধ প্রতিযোগিতার জন্ম দিয়েছে, যেখানে ‘সফল’ হওয়ার একমাত্র মাপকাঠি হলো অর্থ, ক্ষমতা আর সামাজিক প্রতিষ্ঠা। এই ইঁদুরদৌড়ে জিততে গিয়ে আমরা আমাদের সন্তানদের জিপিএ-৫ আর বিলাসী ক্যারিয়ার নিশ্চিত করছি ঠিকই, কিন্তু তাদের হৃদয়ে ‘মানুষ’ হওয়ার বীজটি বুনে দিতে ব্যর্থ হচ্ছি। ফলে, যে সন্তানরা মেধা আর যোগ্যতায় সমাজের উঁচুতলায় আসীন হচ্ছেন, নৈতিকতা ও সচ্চরিত্রের দিক থেকে তাঁরা তলিয়ে যাচ্ছেন এক অতল অন্ধকূপে।

পিতা-মাতার প্রতি দায়িত্ব পালন কোনো করুণা বা আইনি দায়বদ্ধতা নয়, এটি সচ্চরিত্রের অন্যতম প্রধান লক্ষণ। যে মা-বাবা নিজের সোনালি যৌবনের সব মেধা, শ্রম আর স্বপ্ন বিসর্জন দিয়ে সন্তানকে সমাজের বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে শেখালেন, জীবনের শেষ প্রান্তে এসে তাঁদের গলিত লাশ উদ্ধার হওয়া একটি সভ্য রাষ্ট্রের জন্য সবচেয়ে বড় লজ্জার। এই লজ্জা আইনের নয়, এই লজ্জা আমাদের পারিবারিক ও সামাজিক শিক্ষার।

আজকের দিনে দাঁড়িয়ে কেবল আইনের সংশোধন কিংবা নৈতিকতার ফাঁপা বাণী শুনিয়ে এই অবক্ষয় রোধ করা যাবে না। আমাদের ফিরতে হবে গোড়ায়। পরিবার থেকেই শুরু করতে হবে মানবিকতার পাঠ। সন্তানদের শুধু ‘সফল’ নয়, ‘সচ্চরিত্র’ এবং ‘সহানুভূতিশীল’ মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।

রাষ্ট্র ও সমাজকে আজ এই স্পষ্ট বার্তা দিতে হবে যে, পিতা-মাতার দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়া কোনো প্রগতি বা আধুনিকতা নয়, বরং তা এক চরম আদিম বর্বরতা। আইনের কঠোরতা অবশ্যই প্রয়োজন, তবে তার চেয়েও বেশি প্রয়োজন সামাজিক বয়কট ও শুদ্ধাচারের জাগরণ। শেষ জীবনে প্রতিটি মা-বাবা যেন পান একটি নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ এবং ভালোবাসায় ঘেরা আশ্রয়।