৩৩০ ব্যক্তিকে 'দুষ্কৃতকারী' ঘোষণা এবং নগরীতে তাদের প্রবেশ ও অবস্থানের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়ে প্রকাশিত চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের (সিএমপি) গণবিজ্ঞপ্তি নিয়ে নানা মহলসহ খোদ নগর পুলিশেই বিভিন্ন প্রশ্ন উঠেছে।

মাঠপর্যায়ের অপরাধ নিয়ে কাজ করেন সিএমপির বিভিন্ন জোনে কর্মরত এমন অন্তত ৭ কর্মকর্তা দ্য ডেইলি স্টারকে জানিয়েছেন, নির্বাচনকে সামনে রেখে তালিকাভুক্ত অস্ত্রধারী শীর্ষ সন্ত্রাসী এবং আওয়ামী লীগের পলাতক নেতাকর্মীদের গ্রেপ্তার করতে ব্যর্থ হয়ে এই তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে অস্ত্রধারীদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে তাগিদ দিচ্ছেন নির্বাচন সংশ্লিষ্টরা। ঠিক এমন সময়ে চিহ্নিত অস্ত্রধারীদের 'দুষ্কৃতকারী' আখ্যা, নগরীতে তাদের প্রবেশ ও অবস্থানের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়ে সিএমপি কমিশনার ঠিক কী বোঝাতে চেয়েছেন, তা মাঠ পর্যায়ের পুলিশের কাছে পরিষ্কার নয়।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে সিএমপির এক কর্মকর্তা দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, 'অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে সাঁড়াশি অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেপ্তার না করে বহিষ্কারাদেশ আসলেই হাস্যকর। কারণ তারা কেউ তো এখানে বসে নেই। তারা বাইরে থেকেই এখানকার সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করছে।'

 

সিএমপির তালিকায় থাকা ৩৩০ জনের নাম বিশ্লেষণ করেছে দ্য ডেইলি স্টার।

তালিকার ৪ নম্বরে আছেন চট্টগ্রাম নগর বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক ও মুখপাত্র শওকত আজম খাজা।

দ্য ডেইলি স্টারকে তিনি বলেন, 'আমার বিরুদ্ধে আওয়ামী সরকারের আমলে ২২টি রাজনৈতিক মামলা ছিল। যার মধ্যে ১৮টি আদালতে খারিজ হয়েছে। বাকি ৪ মামলায় হাজিরা দিচ্ছি। আমার নাম দেখে আপনাদের মতো আমিও অবাক হয়েছি।'

'দলের পক্ষ থেকে কাল আমরা এ বিষয়ে কমিশনারের সঙ্গে কথা বলবো,' যোগ করেন খাজা ।

তালিকায় ২২৭ নম্বরে থাকা নামটি চসিকের ৩০ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর আতাউল্লা চৌধুরীর। যিনি ২০২৫ সালের নভেম্বরে মারা গেছেন। এ তথ্য নিশ্চিত করেছে নগরীর সদরঘাট থানা পুলিশ।

এই তালিকায় ৮৯ নম্বরে আছে পুলিশ এবং ইন্টারপোলের রেড নোটিশে থাকা শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী ওরফে 'বড় সাজ্জাদ' এর নাম।

পুলিশ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, দীর্ঘ দুই দশক ধরে দেশের বাইরে বসেই সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী ওরফে বড় সাজ্জাদ নগর ও জেলার বিস্তৃত সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক নিয়ন্ত্রণ করছেন। ইন্টারপোলের তালিকায় তিনি সাজ্জাদ হোসেন খান হিসেবে উল্লিখিত।

পুলিশ জানায়, নগরীর চান্দগাঁও, বায়েজিদ বোস্তামী ও পাঁচলাইশ এবং জেলার হাটহাজারী, রাউজানসহ পাঁচ থানার ৫ লাখের বেশি মানুষকে সাজ্জাদের বাহিনীর কারণে আতঙ্কে থাকতে হয়। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে চট্টগ্রামে জোড়া খুনসহ মোট ১১টি খুনের ঘটনায় সাজ্জাদের অনুসারীদের নাম উঠে এসেছে।

সবশেষ কোটি টাকা চাঁদার দাবিতে চন্দনপুরা এলাকায় চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগ নেতা ও স্মার্ট গ্রুপের স্বত্বাধিকারী মুজিবুর রহমানের বাড়িতে ১৫ রাউন্ড গুলি করার অভিযোগ আছে বড় সাজ্জাদ বাহিনীর বিরুদ্ধে। ওই ঘটনায় পুলিশ এখনো অস্ত্রধারী কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি।

তার অনুসারী পুলিশের আরেক তালিকাভুক্ত আসামি সাজ্জাদ হোসেন ওরফে ছোট সাজ্জাদের নাম রয়েছে তালিকার ৩০ নম্বরে। ছোট সাজ্জাদের স্ত্রী শারমিন হোসেন তামান্নার নাম আছে ১৯১ নাম্বারে। এছাড়া বাকলিয়া জোড়া খুনের আসামি সাজ্জাদ গ্রুপের সেকেন্ড-ইন-কমান্ড রায়হান আলম, খোরশেদ, বোরহান ও মোবারক হোসেন ইমনের নাম আছে তালিকায়।

তালিকায় আছেন কারাগারে থাকা চট্টগ্রাম-৬ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ফজলে করিম চৌধুরী ও চট্টগ্রাম-১১ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য এমএ লতিফ। আরও আছেন আওয়ামী লীগের পলাতক সাবেক মন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল, চট্টগ্রাম-১০ আসনের পলাতক সংসদ সদস্য মহিউদ্দিন বাচ্চু, চসিকের সাবেক মেয়র ও পলাতক আওয়ামী লীগ নেতা আজম নাছির উদ্দিন, ফজলে করিমের ছেলে ফারাজ করিম চৌধুরী।

তালিকায় আরও আছে জুলাই আন্দোলনের সময় শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে পিস্তল হাতে নেতৃত্ব দেওয়া আওয়ামী লীগ নেতা হেলাল আকবর চৌধুরী বাবর, নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ নেতা নুরুল আজিম রনি, জামালখান ওয়ার্ড কাউন্সিলর শৈবাল দাশ সুমন, নুর মোস্তফা টিনু, আব্দুল কাদের ওরফে মাছ কাদের, আব্দুল নবী ওরফে মাছ নবী, শাহেদ ইকবাল, এসরারুল হকসহ চসিকের বিভিন্ন ওয়ার্ডের আওয়ামী লীগের পলাতক ওয়ার্ড কাউন্সিলররা।

স্বর্ণবার লুটের ঘটনায় গ্রেপ্তার পুলিশের তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী ও বহিষ্কৃত ছাত্রদল নেতা সাইফুল ইসলাম ওরফে বার্মা সাইফুলসহ বিভিন্ন থানা পুলিশের সোর্সদের নামও আছে '৩৩০ দুষ্কৃতকারী'র তালিকায়।

অস্ত্রধারী শীর্ষ সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তারে অভিযান জোরদার না করে, কেন শহরে ঢুকতে মানা কিংবা বহিষ্কার করার নোটিশ জারি করা হলো—এমন প্রশ্নের জবাবে সিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (অপরাধ) ফয়সাল আহমেদ দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, 'তালিকার বিষয়ে কমিশনার স্যার ভালো বলতে পারবেন। উনাকেই জিজ্ঞেস করুন।'

সিএমপির ওই তালিকায় রয়েছেন চট্টগ্রাম নগর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক ও মুখপত্র শওকত আজম খাজা, চসিক ৩০ নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর আতাউল্লা চৌধুরী, যিনি ২০২৫ সালের নভেম্বরে মারা গেছেন।