‘ওয়ান বক্স’ পলিসিতে হোঁচট: গুরুত্বপূর্ণ আসনে ভোটের হিসাব পাল্টে যেতে পারে
ধর্মভিত্তিক দলগুলোর ভোট 'এক বাক্সে' আনার লক্ষ্যে যে ১১ দলীয় ঐক্য গঠনের প্রক্রিয়া চলছিল, তা থেকে সরে গেছে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ (আইএবি)। এর ফলে বড় ধাক্কা খেয়েছে তাদের 'ওয়ান-বক্স পলিসি'।ইসলামপন্থি ভোটারদের সামনে এখন তিনটি পথ খোলা থাকছে: জামায়াত নেতৃত্বাধীন নির্বাচনী জোট (যেখানে পাঁচটি ইসলামি দল আছে), চরমোনাই পীরের নেতৃত্বাধীন ইসলামী আন্দোলন এবং বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটে থাকা কওমি ঘরানার তিনটি দল।রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা বলছেন, এই বিভক্তি আগামী নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ আসনগুলোর ফলাফলে নির্ধারক ভূমিকা রাখ...
ধর্মভিত্তিক দলগুলোর ভোট 'এক বাক্সে' আনার লক্ষ্যে যে ১১ দলীয় ঐক্য গঠনের প্রক্রিয়া চলছিল, তা থেকে সরে গেছে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ (আইএবি)। এর ফলে বড় ধাক্কা খেয়েছে তাদের 'ওয়ান-বক্স পলিসি'।
ইসলামপন্থি ভোটারদের সামনে এখন তিনটি পথ খোলা থাকছে: জামায়াত নেতৃত্বাধীন নির্বাচনী জোট (যেখানে পাঁচটি ইসলামি দল আছে), চরমোনাই পীরের নেতৃত্বাধীন ইসলামী আন্দোলন এবং বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটে থাকা কওমি ঘরানার তিনটি দল।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা বলছেন, এই বিভক্তি আগামী নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ আসনগুলোর ফলাফলে নির্ধারক ভূমিকা রাখতে পারে।
দৈনিক নয়া দিগন্তের সম্পাদক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক সালাহউদ্দিন মুহাম্মদ বাবর বলেন, 'মানুষ সবচেয়ে যোগ্য প্রার্থীকেই ভোট দেয়। দল হিসেবে ইসলামী আন্দোলনের প্রতি মানুষের ধর্মীয় আবেগ থাকতে পারে, কিন্তু রাজনৈতিকভাবে তা কতটা প্রভাব ফেলবে, তা নিশ্চিত নয়। তাই জামায়াতের ভোটে খুব একটা প্রভাব পড়বে বলে মনে হয় না।'
১৯৮৭ সালে চরমোনাইর পীর সৈয়দ ফজলুল করীমের হাত ধরে ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলনের যাত্রা শুরু। ২০০৮ সালে নির্বাচন কমিশনের নিবন্ধন পেতে দলের নাম পরিবর্তন করা হয়। দলটির বর্তমান আমির সৈয়দ রেজাউল করীম।
সালাহউদ্দিন মুহাম্মদ বাবর বলেন, 'জামায়াতের সঙ্গে থাকলেই ইসলামী আন্দোলন বেশি লাভবান হতো এবং তাদের ভোট বাড়ার সম্ভাবনা থাকত।'
নির্বাচন কমিশনের তথ্যমতে, ১৯৯৬ সালে মাত্র ১১ হাজার ১৫৯ ভোট পাওয়া দলটি ২০১৮ সালের নির্বাচনে ১২ লাখের বেশি ভোট পায়। আওয়ামী লীগ ও বিএনপির পর তৃতীয় সর্বোচ্চ ভোট পায় তারা। যদিও ওই নির্বাচনে ভোটের আগের রাতে ব্যালট বাক্স ভরার অভিযোগ ছিল। ২০১৪ ও ২০২৪ সালে তারা ভোট বর্জন করে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও লেখক মহিউদ্দিন আহমদ বলেন, 'শুরু থেকেই বোঝা যাচ্ছিল যে "ওয়ান-বক্স পলিসি" টিকবে না। কিন্তু জামায়াতের মধ্যে এক ধরনের তাড়না ছিল। তারা এই জোটের মাধ্যমে বিএনপিকে চ্যালেঞ্জ জানাতে চেয়েছিল।'
তবে জামায়াত এতে বড় বিপদে পড়বে এমনটা মনে করেন না মহিউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেন, 'জামায়াতকে এখন নিজের শক্তিতে দাঁড়াতে হবে। দীর্ঘদিনের মিত্র বিএনপির সঙ্গ ছাড়া তারা কতটা শক্তিশালী, এই নির্বাচনে তার পরীক্ষা হয়ে যাবে।'
নিষেধাজ্ঞার কারণে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ অংশ নিতে না পারায় আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠেয় নির্বাচনে মূলত বিএনপি ও জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোটের মধ্যেই লড়াই হবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১০ দলীয় নির্বাচনী ঐক্যে আরও চারটি ইসলামি দল রয়েছে—বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, খেলাফত মজলিস, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন ও বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টি। প্রথমে আটটি দল নিয়ে এই প্ল্যাটফর্ম গঠিত হলেও নির্বাচনের আগে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), এলডিপি ও এবি পার্টি এতে যুক্ত হয়।
গত বৃহস্পতিবার রাতে ১০ দলের পক্ষ থেকে ২৫৩টি আসনে প্রার্থীর নাম ঘোষণা করা হয়। বাকি ৪৭টি আসন ইসলামী আন্দোলনসহ তিন শরিকের জন্য ফাঁকা রাখা হয়। কিন্তু পরদিন ইসলামী আন্দোলন জানিয়ে দেয়, তারা ঐক্যের উদ্যোগে থাকছে না।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক আলতাফ পারভেজ বলেন, 'অনেকে আশা করেছিলেন এবার ইসলামপন্থিদের ভোট এক হবে। কিন্তু দলগুলোর মধ্যে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। জামায়াত মওদুদী মতাদর্শের অনুসারী, আর ইসলামী আন্দোলন দেওবন্দি ঘরানার। তাই তারা একে অপরকে মেনে নিতে পারে না।'
তিনি বলেন, 'ভোটের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি এখন কিছুটা এলোমেলো হয়ে যাবে। ইসলামী আন্দোলন এখন জামায়াতের ভোট ব্যাংকে ভাগ বসাতে চাইবে। এতে নিম্নকক্ষে (সংসদ) ক্ষতি হলেও উচ্চকক্ষে তারা লাভবান হতে পারে।'
১৯৯১ সালের নির্বাচনে জামায়াত ১৮টি আসন ও ১২ দশমিক ১৩ শতাংশ ভোট পেয়েছিল। সেটাই ছিল তাদের সেরা ফলাফল। ২০০১ সালে চারদলীয় জোটে থেকে ১৭টি এবং ২০০৮ সালে দুটি আসন পায় তারা। ২০১৩ সালে নিবন্ধন হারানো জামায়াত গত বছরের জুনে নিবন্ধন ও প্রতীক ফিরে পায়।
১৯৯১ সালের পর থেকে ইসলামি ঐক্যজোট ১৯৯১ ও ১৯৯৬ সালে একটি করে এবং ২০০১ সালে দুটি আসন পায়। এর বাইরে আর কোনো ইসলামি দল থেকে কেউ সংসদ সদস্য হতে পারেননি।