দিনটি ছিল ১৯৭১ সালের ৮ মার্চ। চট্টগ্রামের ষোলশহরের অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট। সকালবেলায় সবার অলক্ষ্যেই একটি ভবনের ছাদে গিয়ে উঠলেন অষ্টম ইস্ট বেঙ্গলের রেজিমেন্টের সেকেন্ড-ইন-কমান্ড (সহ-অধিনায়ক) মেজর জিয়াউর রহমান ও ক্যাপ্টেন অলি আহমদ। তাদের মনে বিক্ষিপ্ত বিভিন্ন ভাবনা। এই বুঝি কেউ এসে পড়ে! কী হতে পারে পরিকল্পনা। কীভাবে তারা বিদ্রোহ গড়ে তুলবেন, কীভাবে পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ যুদ্ধ গড়ে তোলা হবে—এসব নিয়ে তাদের মধ্যে চলল বিস্তারিত আলোচনা। একপর্যায়ে ঠিক করলেন, বিদ্রোহের জন্য তাদের উপযুক্ত সময়ের অপেক্ষা করতে হবে।

চট্টগ্রামে বাঙালি সেনা কর্মকর্তাদের মধ্যে জ্যেষ্ঠতার দিক থেকে জিয়াউর রহমান ছিলেন তৃতীয়। ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টাল সেন্টারের কমান্ড্যান্ট ব্রিগেডিয়ার এম আর মজুমদার ছিলেন সর্বজ্যেষ্ঠ। এরপর ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টাল সেন্টারের প্রধান প্রশিক্ষক লেফটেন্যান্ট কর্নেল এম আর চৌধুরী ছিলেন জ্যেষ্ঠতম।

পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে এ সময় ঢাকায় পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে একাধিক বৈঠক করছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। দেশের গতি-প্রকৃতি সম্পর্কে বুঝতে সেই বৈঠকের ওপর তীক্ষ্ণ নজর রাখছিলেন চট্টগ্রামের সেনা কর্মকর্তারা। আলোচনার মধ্যেই চট্টগ্রাম বন্দরে জাহাজ বোঝাই করে আসছিল সমরাস্ত্র। এমন পরিস্থিতিতে করণীয় ঠিক করতে ১৭ মার্চ চট্টগ্রাম স্টেডিয়ামের সামরিক আইন সদর দপ্তরে চার বাঙালি সেনা কর্মকর্তার একটি গোপন বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন লেফটেন্যান্ট কর্নেল এম আর চৌধুরী, মেজর জিয়াউর রহমান, ক্যাপ্টেন আমীন আহমদ চৌধুরী ও ক্যাপ্টেন অলি আহমদ।

বৈঠকে লেফটেন্যান্ট কর্নেল এম আর চৌধুরী জিয়াউর রহমানকে বললেন, 'জিয়া, তুমি পরিস্থিতি সম্পর্কে কী বুঝতে পারছ? কী হতে যাচ্ছে?' জবাবে জিয়াউর রহমান বললেন, 'ওদের ভাবগতি দেখে পরিষ্কার মনে হচ্ছে ওরা হামলা চালাবে।' তখন এম আর চৌধুরী বললেন, 'সশস্ত্র অভ্যুত্থানই এখন আমাদের একমাত্র পথ।' বৈঠকে জিয়াউর রহমান বললেন, 'লেফটেন্যান্ট কর্নেল এম আর চৌধুরীর নেতৃত্বেই আমরা বিদ্রোহ করব।'

কয়েক দিনের মধ্যে পরিস্থিতি আরও ঘোলাটে হতে শুরু করে। ২১ মার্চ পাকিস্তানি বাহিনীর প্রধান জেনারেল হামিদ খান চট্টগ্রামে আসেন। সেখানে এক মধ্যাহ্নভোজে পাকিস্তানি বাহিনীর অফিসারদের কানাঘুষা ও জেনারেল হামিদ খানের একটি উক্তিতেই পরিষ্কার হয়ে গেল, বাঙালিদের ওপর ভয়াবহ হামলা আসন্ন। সেই মধ্যাহ্নভোজে জেনারেল হামিদ খান বাঙালি অফিসারদের যেন চিনতেই পারলেন না।

তিনি অবাঙালি অফিসারদের সঙ্গেই সব কথা বলছিলেন ও নির্দেশনা দিচ্ছিলেন। গোয়েন্দা সেনা কর্মকর্তা জিয়াউর রহমানের মন ভীষণ খটকা লাগল। তিনি রহস্যের আভাস পাচ্ছিলেন। তার অনুসন্ধানী দৃষ্টি ও মন তখন খুঁজছিল ষড়যন্ত্রের গন্ধ।

কৌশলে একজনের সঙ্গে কথা বলতে বলতে জিয়াউর রহমান জেনারেল হামিদ খানের দিকে এগোলেন। জেনারেল হামিদ খান তখন ২০তম বেলুচ রেজিমেন্টের কমান্ডিং অফিসার অবাঙালি লেফটেন্যান্ট কর্নেল ফাতমীর সঙ্গে কথা বলছিলেন। একপর্যায়ে জেনারেল হামিদ নির্দেশনার সুরে উর্দুতে বললেন, 'দেখো ফাতমী, অ্যাকশন কিন্তু খুব দ্রুত এবং কম সময়ের মধ্যে হতে হবে। আমাদের পক্ষে যেন কেউ হতাহত না হয়।'

এ কথা শুনেই জিয়াউর রহমানের মন আঁতকে উঠল। পরিস্থিতি যে প্রতিকূলে, তা বুঝতে আর তার বাকি রইল না। সেদিন বিকেলে মেজর জিয়া ব্রিগেডিয়ার এম আর মজুমদারের বাসায় গিয়ে তাকে পরিস্থিতি সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলেন। জবাবে ব্রিগেডিয়ার মজুমদার বললেন, 'আমাকে জেনারেল হামিদ খানের মিটিংয়ে ঢুকতেই দেওয়া হয়নি। আমাকে পাকিস্তানি অফিসাররা বিশ্বাস করে না।' তখন জিয়াউর রহমান জিজ্ঞেস করলেন, 'আপনার কী মনে হচ্ছে?' জবাবে ব্রিগেডিয়ার মজুমদার বললেন, 'সামথিং ফিশি!' জবাবে জিয়াউর রহমান বললেন, 'ফিশি নয়। তারা বড় ধরনের এক চক্রান্ত করছে।'

পরদিন ২২ মার্চ রাতে ইপিআর সেক্টর দপ্তরের অ্যাডজুট্যান্ট ক্যাপ্টেন রফিক জিয়াউর রহমানের কাছে এসে বললেন, 'সময় দ্রুত এগিয়ে আসছে। আমাদের জলদি বিদ্রোহ ঘোষণা করতে হবে। আপনার প্রতি আমাদের আস্থা আছে, আপনি বিদ্রোহ ঘোষণা করুন।' এ সময় জিয়াউর রহমান খোলাখুলিভাবে তার পরিকল্পনার কথা জানালেন।

২৫ মার্চ চট্টগ্রাম ক্যান্টনমেন্টের প্রশাসনিক ব্যবস্থায় ব্যাপক রদবদল করে পাকিস্তানি বাহিনী। এদিন পুনরায় জেনারেল হামিদ খানের নেতৃত্বে পাকিস্তানি শীর্ষস্থানীয় জেনারেলরা চট্টগ্রামে আসেন। বৈঠকের একপর্যায়ে তারা ব্রিগেডিয়ার এম আর মজুমদার ও ক্যাপ্টেন আমীন আহমদ চৌধুরীকে সঙ্গে নিয়ে ঢাকায় ফিরে যান। ব্রিগেডিয়ার মজুমদারের স্থলে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টাল সেন্টারের দায়িত্ব দেওয়া হয় ব্রিগেডিয়ার আনসারীকে ও ইপিআরের দায়িত্ব পান কর্নেল শিগারী।

এদিন রাতে হঠাৎই গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লেন কর্নেল এম আর চৌধুরী। চট্টগ্রাম বন্দরে তখন পাকিস্তানি অস্ত্রবোঝাই জাহাজ সোয়াত খালাসের অপেক্ষায়। অস্ত্র যেন কোনোভাবেই পাকিস্তানি সেনাদের হাতে পৌঁছাতে না পারে, সে লক্ষ্যে চট্টগ্রাম শহরের রাস্তায় রাস্তায় গুঁড়ি ফেলে, ব্যারিকেড স্থাপন করে ছাত্র-জনতা প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল। অন্যদিকে এই ব্যারিকেড সরানোর কাজে নিয়োজিত করা হলো বাঙালি সেনাদেরই।

রাত ১১টার দিকে অষ্টম বেঙ্গলের কমান্ডার কর্নেল জানজুয়া মেজর জিয়াকে এক কোম্পানি সেনা নিয়ে চট্টগ্রাম বন্দরে যাওয়ার নির্দেশ দেন। কিন্তু এই নির্দেশের অর্থ প্রথমে বোধগম্য হলো না জিয়ার কাছে। রাত সাড়ে ১১টার দিকে কর্নেল জানজুয়া মেজর জিয়াকে নৌবাহিনীর একটি ট্রাকে তুলে ক্যান্টনমেন্ট থেকে বন্দরের উদ্দেশ্যে রওনা দিতে বললেন।কিন্তু রাস্তায় জনতার ফেলা ব্যারিকেডের কারণে সামনে এগোতে বেগ পেতে হচ্ছিল। আগ্রাবাদের কাছে বড় একটি ব্যারিকেড পড়ল। মেজর জিয়া ট্রাক থেকে নামলেন।

ঠিক এমন সময় এক ডজ গাড়ি থেকে ক্যাপ্টেন খালিকুজ্জামান দ্রুত নেমে তাকে টানতে টানতে রাস্তার একপাশে নিয়ে গিয়ে বললেন, 'পাকিস্তানিরা সব জায়গায় গোলাগুলি শুরু করে দিয়েছে। শহরে অসংখ্য মানুষ নিহত হয়েছে। এখন আপনি কী করবেন, সময় মাত্র আধা মিনিট রয়েছে।' মেজর জিয়া হাত উঁচু করে নির্দেশনার সুরে বললেন, 'উই রিভোল্ট!'

জিয়াউর রহমান তখন ক্যাপ্টেন খালিকুজ্জামানকে ফিরে গিয়ে ক্যাপ্টেন অলি আহমদকে ব্যাটালিয়ন তৈরি এবং পশ্চিম পাকিস্তানি সব অফিসারকে গ্রেপ্তারের নির্দেশ দেন। এরপর মেজর জিয়া তার পাশে থাকা পাকিস্তানি অফিসার ও বাকি পাকিস্তানিদের আত্মসমর্পণের নির্দেশ দিলেন। হকচকিত সেনারা আত্মসমর্পণ করতেই তিনি ট্রাক ঘুরিয়ে ক্যান্টনমেন্টে চলে গেলেন।

এরপর মেজর জিয়া একাই গাড়ি নিয়ে সরাসরি কমান্ডিং অফিসার জানজুয়ার বাড়িতে চলে গেলেন। কলিংবেলের শব্দে জানজুয়ার ঘুম ভাঙল। দরজা খুলতেই তিনি যেন ভূত দেখার মতো চমকে উঠলেন। তার ধারণা ছিল মেজর জিয়া ততক্ষণে চট্টগ্রাম বন্দরে বন্দী হয়েছেন। কর্নেল জানজুয়াকে গ্রেপ্তার করে সরাসরি ষোলশহরে নিয়ে আসেন জিয়াউর রহমান। এরপর অফিসার্স মেসে ফিরে মেজর মীর শওকত আলীকে বিদ্রোহের কথা বললেন জিয়াউর রহমান। মেজর শওকতও তখন যুদ্ধে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।

এ সময় জিয়াউর রহমান চট্টগ্রামে জনপ্রতিনিধি ও বেসামরিক অফিসারদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করতে লাগলেন। কিন্তু তাদের না পেয়ে একপর্যায়ে তিনি টেলিফোন অপারেটরকে সবার সঙ্গে যোগাযোগ করে বিদ্রোহের কথা প্রচার করার নির্দেশনা দেন। লেফটেন্যান্ট কর্নেল এম আর চৌধুরীর সঙ্গেও যোগাযোগের চেষ্টা করতে লাগলেন জিয়াউর রহমান। কিন্তু তখনও তিনি জানতে পারেননি, রাতেই ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টাল সেন্টারে গুরুতর অসুস্থ এম আর চৌধুরীকে নৃশংস কায়দায় হত্যা করেছে বেলুচ সেনারা।

রাতেই মেজর জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে চট্টগ্রামব্যাপী বিদ্রোহ শুরু হয়। রাত ২টার দিকে অষ্টম বেঙ্গলের ২৫০ বাঙালি সেনাকে একত্রিত করেন জিয়া। উপস্থিত সব সেনা জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে 'দেশের স্বাধীনতার জন্য আমরা জান দিতে প্রস্তুত' বলে শপথ নিলেন। কিছু সেনাকে ষোলশহরে রেখে বাকি সেনাদের নিয়ে কালুরঘাটের উদ্দেশে যাত্রা করেন জিয়াউর রহমান।

২৬ মার্চের সকালের মধ্যে ঢাকার সম্পূর্ণ কর্তৃত্ব তখনো পাকিস্তানি প্রশাসনের হাতে। কিন্তু চট্টগ্রাম তখনো মুক্তিকামী বাঙালি সেনাদের দখলে। ২৬ মার্চ চট্টগ্রাম শহরে দিনভর প্রতিরোধ যুদ্ধ চলে। একপর্যায়ে ২৭ মার্চ চট্টগ্রাম দখলের জন্য পশ্চিম পাকিস্তান থেকে আনা হয় দ্বিতীয় কমান্ডো ব্যাটালিয়ন। পাকিস্তান নৌবাহিনীর যুদ্ধজাহাজ বাবরে করে চট্টগ্রাম বন্দরে আনা হয় দুই ব্যাটালিয়ন সেনাকে। যুদ্ধের পরিকল্পনার জন্য কমান্ডো অধিনায়ক জেনারেল মিঠা খানকে পাঠানো হয় চট্টগ্রামে। চট্টগ্রাম শহরে দখলের চেষ্টা করলে পরিস্থিতি ভয়াবহ বিপজ্জনক হতে পারে বুঝতে পেরে অবশিষ্ট সেনারাও শহর ত্যাগ করেন।

২৭ মার্চ সকাল ১১টার দিকে কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করেন মেজর জিয়াউর রহমান। জিয়াউর রহমানের আগে একাধিকজন ঘোষণাটি পাঠ করলেও মেজর জিয়াউর রহমানের ঘোষণা পাঠটি সমগ্র চট্টগ্রামে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। তার পাঠ করা ঘোষণার সংবাদ সমস্ত দেশব্যাপী ক্রমশ ছড়িয়ে পড়ে।

চট্টগ্রামের গেরিলা বাহিনীর অন্যতম গ্রুপ কমান্ডার মুক্তিযোদ্ধা ডা. মাহফুজুর রহমান বলেন, 'জিয়াউর রহমানের ঘোষণা চট্টগ্রামে বারুদের মতো কাজ করেছিল। জিয়াকে তখন চট্টগ্রামের মানুষ না চিনলেও যখন তারা দেখল এই অঞ্চলের একজন শীর্ষস্থানীয় বাঙালি অফিসার যুদ্ধের আহ্বান করছেন, তখন তা সাধারণ মানুষকে যুদ্ধে যোগ দিতে দারুণভাবে উদ্বুদ্ধ করেছিল।'

চট্টগ্রাম শহর পাকিস্তানিদের দখলে থাকলেও ১১ এপ্রিল পর্যন্ত কালুরঘাট থেকে ইস্ট বেঙ্গলের সেনা, ইপিআর ও পুলিশ সদস্যদের নিয়ে একের পর এক যুদ্ধের নেতৃত্ব ও নির্দেশনা দিয়েছিলেন জিয়াউর রহমান।

এই সময়ের মধ্যেই মুক্তিযুদ্ধের ৪ এপ্রিল হবিগঞ্জের তেলিয়াপাড়ার চা–বাগানের ম্যানেজারের ডাকবাংলোতে অনুষ্ঠেয় মুক্তিযুদ্ধের প্রথম আনুষ্ঠানিক বৈঠকে নেতৃত্বস্থানীয় ভূমিকা রেখেছিলেন জিয়াউর রহমান। যেখানে মুক্তিবাহিনীর ২৭ জন বাঙালি অফিসার ছাড়াও উপস্থিত ছিলেন ভারতীয় বাহিনীর শীর্ষস্থানীয় সামরিক কর্মকর্তারা। ঐতিহাসিক সে সভায় বাংলাদেশকে চারটি অঞ্চলে বিভক্ত করে সেক্টর গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম ও নোয়াখালী জেলার পূর্বাঞ্চলের যুদ্ধ পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল জিয়াউর রহমানকে।

বৈঠকে জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে সেনাসংখ্যা বৃদ্ধির পাশাপাশি চট্টগ্রাম দখলের জন্য তার অধীনে দুটি কোম্পানিকে রামগড়ের দিকে পাঠানোর সিদ্ধান্ত হয়। এই দুটি কোম্পানি ছিল যথাক্রমে ক্যাপ্টেন মতিনের নেতৃত্বাধীন চতুর্থ বেঙ্গলের ব্রাভো কোম্পানি ও ক্যাপ্টেন এজাজের নেতৃত্বাধীন দ্বিতীয় বেঙ্গলের চার্লি কোম্পানি।

এর চার দিন পর ১০ এপ্রিল প্রবাসী সরকার গঠিত হলে ১ নম্বর সেক্টরের সেক্টর কমান্ডারের দায়িত্ব পান জিয়াউর রহমান। জুন মাসের শেষ সপ্তাহ পর্যন্ত এ সেক্টরের কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন তিনি। এ সময় তার দূরদর্শী নেতৃত্ব ও নির্দেশনায় পার্বত্য চট্টগ্রামকে রীতিমতো দুর্গে পরিণত করেছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধারা।

মে মাসের মাঝামাঝি সময়ে মুক্তিবাহিনীর উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে মুক্তিযুদ্ধকালীন প্রথম ব্রিগেড গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ১ম, ৩য় ও ৮ম বেঙ্গল রেজিমেন্টের সমন্বয়ে ব্রিগেডটি গঠন করবেন বলে জানান জিয়াউর রহমান। মুক্তিযুদ্ধের শুরুতে এই তিনটি ব্যাটালিয়নে পেশাদার নিয়মিত বাহিনী ছিল। কিন্তু আড়াই মাসের যুদ্ধে ব্যাটালিয়নগুলোর অনেক সেনাই শহীদ ও হতাহত হয়েছিলেন। ফলে এসব ব্যাটালিয়নে অনিয়মিত বাহিনীর সদস্য ও গণযোদ্ধাই বেশি ছিলেন। তাই জিয়াউর রহমান এই তিনটি ব্যাটালিয়নের মুক্তিযোদ্ধাদের পূর্ণাঙ্গ সামরিক প্রশিক্ষণের জন্য মেঘালয়ের তুরায় প্রশিক্ষণ শিবির গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নেন। তুরায় এই সেনাদের ছয় সপ্তাহের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। জিয়াউর রহমানের নির্দেশনাতেই তিনটি ব্যাটালিয়নকে সমন্বিত প্রশিক্ষণের পাশাপাশি প্রথাগত যুদ্ধেরও প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছিল। প্রশিক্ষণের বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করতেন জিয়াউর রহমান নিজেই।

জুলাই মাসের প্রথম সপ্তাহে সেক্টর কমান্ডার সম্মেলন থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে জেড ফোর্সের আত্মপ্রকাশ ঘোষণা করা হয়। জেড ফোর্সের 'জেড' আদ্যক্ষরটি নেওয়া হয়েছিল জিয়া নাম থেকেই। মুক্তিযুদ্ধের প্রথম তিনটি প্রচলিত যুদ্ধে (কনভেনশনাল ওয়ার) অংশ নিয়েছিলেন জেড ফোর্সের মুক্তিযোদ্ধারাই। মুক্তিযুদ্ধের প্রথম প্রচলিত যুদ্ধ কামালপুরের যুদ্ধে সমন্বয়ের জন্য জিয়াউর রহমান খোদ নিজেই সার্বক্ষণিক রণাঙ্গনে উপস্থিত ছিলেন।

ব্রিগেড কমান্ডারের পাশাপাশি অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে জুলাই মাস থেকে অক্টোবর মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহ পর্যন্ত ১১ নম্বর সেক্টরে সেক্টর কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন জিয়াউর রহমান।

মুক্তিযুদ্ধের আগস্ট মাসে কুড়িগ্রামের রৌমারীকে মুক্তাঞ্চল হিসেবে গড়ে তোলার প্রথম প্রস্তাবনাও দিয়েছিলেন জিয়াউর রহমান। এ লক্ষ্যে প্রথমে তিনি মুক্তিবাহিনীর শীর্ষ পর্যায়ে ও প্রবাসী সরকারকে অনুরোধ করেন। পরবর্তীতে তার উদ্যোগে রৌমারীতে বাংলাদেশের প্রথম বেসামরিক প্রশাসনিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়। যুদ্ধকালীন সময়ে বাংলাদেশের প্রথম ক্যান্টনমেন্ট এবং সামরিক প্রশিক্ষণ স্কুল রৌমারীতে গড়ে তোলা হয়। যেখানে প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন ৩০ হাজারেরও বেশি মুক্তিযোদ্ধা।

রৌমারীকে মুক্তাঞ্চল হিসেবে ধরে রাখার জন্য জেড ফোর্সের অধীনস্থ ১ম ও ৩য় বেঙ্গলের একাধিক কোম্পানিকে রৌমারীতে পাঠানোর নির্দেশনাও দিয়েছিলেন জিয়াউর রহমান। ১১ আগস্ট থেকে ৫ অক্টোবর পর্যন্ত নিয়মিতভাবেই রৌমারী মুক্তাঞ্চলে পরিদর্শন করেন তিনি।

২৮ আগস্ট রৌমারীতে মুক্তিযোদ্ধাদের উদ্দেশ্যে দেওয়া এক ভাষণে জিয়াউর রহমান বলেছিলেন, 'রৌমারীতে এলে আমি স্বাধীনতার স্বাদ পাই।'

এ সময় রৌমারী মুক্তাঞ্চলের ওপর ভিত্তি করে মার্কিন এনবিসি টেলিভিশন নির্মাণ করে 'দ্য কান্ট্রি মেড ফর ডিজাস্টার' ও 'ডেড লাইন বাংলাদেশ' শিরোনামের দুটি প্রামাণ্যচিত্র। এই দুটি প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণের পর যুক্তরাষ্ট্রে প্রদর্শিত হওয়ার পরে বিশ্বজুড়েই মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষে ব্যাপক জনমত গড়ে ওঠে। রৌমারী মুক্তাঞ্চল হিসেবে গড়ে না উঠলে এই দুটি প্রামাণ্যচিত্রের নির্মাণকাজ ও সমাপ্ত হতো না।

অক্টোবর মাসে সিলেটের যুদ্ধে গতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে ও সিলেটকে মুক্ত করার লক্ষ্যে জেড ফোর্স সিলেটের যুদ্ধে যুক্ত হয়। এ সময় জিয়াউর রহমানের উদ্যোগে জেড ফোর্সে মুক্তিযুদ্ধের দ্বিতীয় ফিল্ড ব্যাটারি আর্টিলারি তথা রওশন আরা ব্যাটারি যুক্ত হয়। একই সঙ্গে যুক্ত করা হয় একটি সিগন্যাল কোম্পানিও।

পূর্বে পাকিস্তানি গোয়েন্দা সেনা কর্মকর্তা হিসেবে অভিজ্ঞতা থাকায় জিয়াউর রহমান পাকিস্তানি বাহিনীর সেনাদের মনস্তত্ত্ব সম্পর্কে জানতেন। ফলে তিনি সিলেটের যুদ্ধে প্রথমেই চা–বাগানকে হানাদারমুক্ত করার সিদ্ধান্ত নেন। এ অনুযায়ী তিনি নকশাও প্রণয়ন করেছিলেন। তার নেতৃত্ব, নির্দেশনা ও পরিকল্পনায় একে একে ধলই, পাত্রখোলা, ফুলতলা, সাগরনাল, ধামাই ও দিলকুশসহ বিভিন্ন চা–বাগানে দুঃসাহসিক যুদ্ধে অবতীর্ণ হন জেড ফোর্সের মুক্তিযোদ্ধারা।

প্রথমে চা–বাগানের যুদ্ধে সফলতা এবং পরে সিলেটের সরাসরি সম্মুখ ও নিয়মিত যুদ্ধে জেড ফোর্সের তিনটি ব্যাটালিয়নের সেনারা অপ্রত্যাশিত সফলতা অর্জন করে। একে একে ছোটখেল, গোয়াইনঘাট, রাধানগর, টেংরাটিলা, লামাকাজি, সালুটিকর হয়ে এমসি কলেজ যুদ্ধের মধ্য দিয়ে জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে সিলেট মুক্ত করার দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে যান জেড ফোর্সের মুক্তিযোদ্ধারা।

একপর্যায়ে ১৫ ডিসেম্বর সিলেটে অবস্থানরত পাকিস্তানি শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তারা জেড ফোর্স অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল জিয়াউর রহমানের কাছে আত্মসমর্পণের সিদ্ধান্ত জানান। এদিন সিলেট রেলওয়ে স্টেশনে পাকিস্তানি বাহিনীর ১২৫ জন অফিসার ও ৭০০–এর বেশি পাকিস্তানি সেনা জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বাধীন জেড ফোর্সের কাছে আত্মসমর্পণ করে।

মুক্তিযুদ্ধে একাধারে অবিস্মরণীয় ও নেতৃত্বস্থানীয় ভূমিকার স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৭৩ সালে তৎকালীন সরকার জিয়াউর রহমানকে মুক্তিযুদ্ধের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সামরিক খেতাব বীর উত্তমে ভূষিত করে, যা তার যুদ্ধক্ষেত্রে অনন্য বীরত্ব ও নেতৃত্বের স্বীকৃতি।

তথ্যসূত্র:
১. বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ: দলিলপত্র নবম ও দশম খণ্ড
২. বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ: সেক্টরভিত্তিক ইতিহাস, সেক্টর ১ ও ১১
৩. বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ: ব্রিগেডভিত্তিক ইতিহাস
৪. রক্তে ভেজা একাত্তর/মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমেদ বীর বিক্রম
৫. সেদিন চট্টগ্রামে যেমন করে স্বাধীনতা লড়াই শুরু হয়েছিল/দৈনিক বাংলা, ২৬ মার্চ ১৯৭২
৬. ১৯৭১ ও আমার সামরিক জীবন/মেজর জেনারেল আমীন আহম্মেদ চৌধুরী
৭. লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে/রফিকুল ইসলাম বীর উত্তম
৮. বাঙালির জাতীয়তাবাদী সংগ্রাম মুক্তিযুদ্ধে চট্টগ্রাম/মাহফুজুর রহমান