রাজনৈতিক সহিংসতার ৬০০ ঘটনায় নিহত ১৫৮
২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে সারা দেশে কমপক্ষে ৬০০টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় ১৫৮ জন রাজনৈতিক কর্মী নিহত হয়েছেন। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) এক প্রতিবেদনে এমন তথ্য উঠে এসেছে।প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এসব সহিংস ঘটনায় সাত হাজার ৮২ জন আহত হয়েছেন। এর মধ্যে ৫৫০টি অর্থাৎ ৯১ দশমিক ৭ শতাংশ ঘটনায় বিএনপির সম্পৃক্ততা ছিল। নিষিদ্ধঘোষিত আওয়ামী লীগের সম্পৃক্ততা ছিল ১২৪টি অর্থাৎ ২০ দশমিক ৭ শতাংশ ঘটনায়। আর জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টি যথাক্রমে ৭...
২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে সারা দেশে কমপক্ষে ৬০০টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় ১৫৮ জন রাজনৈতিক কর্মী নিহত হয়েছেন। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) এক প্রতিবেদনে এমন তথ্য উঠে এসেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এসব সহিংস ঘটনায় সাত হাজার ৮২ জন আহত হয়েছেন। এর মধ্যে ৫৫০টি অর্থাৎ ৯১ দশমিক ৭ শতাংশ ঘটনায় বিএনপির সম্পৃক্ততা ছিল। নিষিদ্ধঘোষিত আওয়ামী লীগের সম্পৃক্ততা ছিল ১২৪টি অর্থাৎ ২০ দশমিক ৭ শতাংশ ঘটনায়। আর জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টি যথাক্রমে ৭ দশমিক ৭ ও ১ দশমিক ২ শতাংশ ঘটনায় জড়িত ছিল।
প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ১১ ডিসেম্বর নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার ৩৬ দিনের মধ্যে কমপক্ষে ১৫ জন রাজনৈতিক নেতা ও কর্মী নিহত হয়েছেন। গতকাল সোমবার রাজধানীর ধানমন্ডিতে টিআইবি কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে 'কর্তৃত্ববাদ পতন-পরবর্তী দেড় বছর: প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি' শীর্ষক পর্যবেক্ষণভিত্তিক গবেষণা প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়।
জুলাই আন্দোলনের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধের সঙ্গে সম্পর্কিত ৮৩৭টি হত্যা মামলাসহ এক হাজার ৭৮৫টি মামলা ২০২৫ সালের ১৯ নভেম্বর পর্যন্ত সারা দেশে দায়ের হয়। এর মধ্যে ৬৬৩টি মামলা ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে দায়ের করা হয়, যার মধ্যে ৪৫৩টিই হত্যা মামলা।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মাত্র ১০৬টি মামলায় চার্জশিট জমা দেওয়া হয়েছে, যার মধ্যে ৩১টি হত্যা মামলা রয়েছে, যা তদন্তের ধীর অগ্রগতি নির্দেশ করে। এসব মামলায় এ পর্যন্ত আওয়ামী লীগ সরকারের ১২৮ জন সাবেক মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, আন্দোলনের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য এক হাজার ১৬৮ জন কর্মরত এবং সাবেক পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ৭৬১টি মামলা দায়ের করা হয়। এর মধ্যে ৬১ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে এ পর্যন্ত ৪৫০টি অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে, এর মধ্যে ৪৫টি আমলে নেওয়া হয়েছে। এসব মামলায় ২০৯ জনকে অভিযুক্ত এবং ৮৪ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বর্তমানে ১০৫ জন অভিযুক্তের বিরুদ্ধে ১২টি মামলা আইসিটিতে বিচারাধীন।
টিআইবি জানায়, অনেক অভিযুক্ত ব্যক্তি দেশ ছেড়ে পালিয়ে গেছেন। অভিযোগ রয়েছে, সেনাবাহিনী, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা এবং স্থানীয় রাজনৈতিক নেতারা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে তাদের পালাতে সহায়তা করেছেন।
জুলাই আন্দোলনের পর মামলা দায়েরের ক্ষেত্রে টিআইবি উদ্বেগ জানিয়েছে। প্রতিবেদনে অনুমান করা হয়েছে, সারা দেশে প্রায় দেড় লাখ লোককে এসব মামলায় অভিযুক্ত করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে, 'মামলা বাণিজ্য', প্রতিশোধমূলক মামলা, রাজনৈতিক হয়রানি ও চাঁদাবাজির অভিযোগের বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে মামলায় নামের অন্তর্ভুক্তি কিংবা মামলা থেকে নাম বাদ দেওয়ার প্রতিশ্রুতির বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত। অনেক ক্ষেত্রে, চাপের কারণে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো যথাযথ তদন্ত ছাড়াই মামলা নিয়েছে।
টিআইবি আইসিটিতে নিযুক্ত বিচারক এবং প্রসিকিউটরদের যোগ্যতা এবং রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা নিয়েও উদ্বেগ জানিয়েছে।
এতে আরও বলা হয়েছে, সাংবাদিকদের হত্যা মামলায় অভিযুক্ত করা হয়েছে, যা বিচার ব্যবস্থার অপব্যবহার নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলছে।
সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দিতে গিয়ে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান সতর্ক করে বলেন, মব সহিংসতা নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা আসন্ন ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনকে প্রভাবিত করতে পারে।
তিনি আরও বলেন যে, বাংলাদেশে মব সহিংসতার ঘটনা 'আসলে সরকারের ভেতর থেকেই শুরু হয়েছিল'। তিনি বলেন, সচিবালয়ে প্রথম মবের উৎপত্তি হয়েছিল। সরকারের বাইরের শক্তি যাদের আজ মব বলি, তারা ক্ষমতায়িত হয়েছে সেই মবের কারণে। এতে সরকারের নৈতিক ভিত্তিও দুর্বল হয়েছে।
নির্বাচন-সম্পর্কিত সহিংসতা সম্পর্কে, ইফতেখারুজ্জামান সতর্ক করে বলেন, আমরা সবাই আশা করি একটিও হত্যাকাণ্ড ঘটবে না... তবে আমরা এর নিশ্চয়তা দিতে পারি না। আমরা মনে করি সহিংসতার ঝুঁকি কেবল ১২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত নয়, পরবর্তী কয়েক দিন পর্যন্তও থাকবে।
তিনি বলেন, সরকার ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতন এবং তাদের পদক্ষেপ নেওয়ার ক্ষমতা, দক্ষতা এবং অভিজ্ঞতা রয়েছে। তবে, তিনি বাংলাদেশের অতীত নির্বাচনী ইতিহাস বিবেচনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশে নির্বাচন খুব কমই সম্পূর্ণরূপে সহিংসতামুক্তভাবে হয়েছে... এবার সহিংসতা রোধে পূর্ববর্তী নির্বাচন থেকে শিক্ষা নেওয়া উচিত।
টিআইবি প্রধান জুলাই-পরবর্তী জবাবদিহিতা প্রক্রিয়া নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, আন্দোলনের সময় হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে সাংবাদিকদের গণহারে মামলায় গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
তিনি সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে এই ধরনের পদক্ষেপ কি ন্যায়বিচারের কাজ নাকি প্রতিশোধের কাজ, তা জানতে চেয়ে সতর্ক করে বলেন, এটি প্রকৃত অপরাধী এবং কর্তৃত্ববাদের দোসরদের শনাক্ত করা কঠিন করে তোলে।
সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, রাজনীতিবিদ এবং আমলারা জুলাইয়ের আন্দোলন থেকে কিছুই শেখেননি এবং তারা তাদের নিজস্ব স্বার্থ রক্ষায় মনোনিবেশ করেছেন। ফলস্বরূপ, তারা জনগণের কাছে জবাবদিহিতাপূর্ণ সরকার গঠনের লক্ষ্যে ঐকমত্য কমিশনের সামনে উত্থাপিত প্রস্তাবগুলোর বিরোধিতা করেন।
তিনি বলেন, যদি নোট অব ডিসেন্টের মৌলিক ধারণা গৃহীত হয়, তাহলে ঐকমত্যের মাধ্যমে গৃহীত সিদ্ধান্তগুলি এখনো বাস্তবায়ন করা যেতে পারে।
ইফতেখারুজ্জামান বলেন, সংখ্যাগরিষ্ঠদের মতামতকে প্রাধান্য দেওয়ার রীতি বিশ্বব্যাপী প্রচলিত। তবে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এমনটি হবে কি না, সেটি দেখার বিষয়। গণভোটের রায় 'হ্যাঁ'-এর পক্ষে গেলে সে ক্ষেত্রে যারা সরকারে যাবে, তাদের সদিচ্ছার ওপর সংস্কার বাস্তবায়ন নির্ভর করবে।
তিনি বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার তাদের সম্পদের বিবরণী জনসমক্ষে প্রকাশ করে একটি উদাহরণ স্থাপন করতে পারত, কিন্তু তা করেনি।
ইফতেখারুজ্জামান সাম্প্রতিক দুটি অধ্যাদেশ- সম্প্রচার কমিশন অধ্যাদেশ এবং মিডিয়া কমিশন অধ্যাদেশের সমালোচনা করে বলেন, গণমাধ্যমকে ইচ্ছাকৃতভাবে উপেক্ষা করা হয়েছে এবং নতুন ঝুঁকি তৈরি করা হয়েছে।
তিনি প্রশ্ন তোলেন, গণমাধ্যম স্বাধীনভাবে পেশাদারত্বের সঙ্গে নিরাপদে কাজ করুক—এ চিন্তাভাবনা অন্তর্বর্তী সরকার ধারণ করেছে কি না। দুটি মিডিয়া কমিশন লোকদেখানো পদক্ষেপ ছাড়া আর কিছু নয় বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
বিচার বিভাগীয় সংস্কার সম্পর্কে তিনি বলেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার কিছু ইতিবাচক পদক্ষেপ নিয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে বিচার বিভাগীয় নিয়োগ কমিটি গঠন এবং একটি স্বাধীন বিচার বিভাগীয় সচিবালয়ের দিকে অগ্রসর হওয়া।
তবে, তিনি উল্লেখ করেন, এসব পদক্ষেপ কতটুকু কার্যকর হবে, তার জবাব পরবর্তী সরকারকে দিতে হবে। এ ছাড়া বিচারব্যবস্থার ভেতরে দলীয়করণ এখনো বড় চ্যালেঞ্জ।
তিনি রাজনৈতিক দলগুলোকে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান এবং পেশাজীবী সংস্থাগুলোকে রাজনীতিমুক্ত রাখার জন্য দৃঢ় অঙ্গীকারবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান।